ব্রেকিং >>
ব্রেকিং >>

মূলধন ও সম্পদের  এগিয়ে থাকায় ব্যাংক খাতে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | 3 বার পঠিত | প্রিন্ট

মূলধন ও সম্পদের  এগিয়ে থাকায় ব্যাংক খাতে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা
Responsive Ad Banner

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারে ৪৪ থেকে ৮১ শতাংশ পর্যন্ত দরবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিনিয়োগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএএল বাংলাদেশ। ব্যাংক খাতে চলমান সংস্কার ও আর্থিক পুনর্গঠনের ফলে তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ এবং বাজারে নিজেদের অংশীদারত্ব বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ক্ষেত্রে তাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক।

‘ব্যাংকিং অন দ্য নেক্সট সাইকেল’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে সিএএল বাংলাদেশ সম্পদের গুণগত মান, মূলধনের পর্যাপ্ততা, তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা এবং ঋণ বিতরণের সামর্থ্য বিশ্লেষণ করে ১৪টি ব্যাংককে ‘সাইকেল-রেডি’ বা সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়নে, ব্যাংক খাতের চলমান আর্থিক পুনর্বিন্যাসের চাপ মোকাবিলা এবং ঋণের চাহিদা পুনরুজ্জীবিত হলে তার সুফল গ্রহণের ক্ষেত্রে এসব ব্যাংক তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

Responsive Ad Banner

প্রতিবেদনে নির্বাচিত পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের সম্ভাব্য লক্ষ্যদর তুলে ধরা হয়েছে। গত ৫ অক্টোবরের সমাপনী দরকে ভিত্তি ধরে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৭ টাকা ৪৫ পয়সা। ওই দিন শেয়ারটির সমাপনী দর ছিল ৬৫ টাকা। সেই হিসাবে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধির পরিমাণ ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ।

সিটি ব্যাংকের জন্য লক্ষ্যদর নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮ টাকা ৩৬ পয়সা। ৫ অক্টোবর ব্যাংকটির শেয়ার ২৯ টাকা ৭০ পয়সায় লেনদেন শেষ করে। সে অনুযায়ী সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ।

ইস্টার্ন ব্যাংকের শেয়ারের লক্ষ্যদর ৩৪ টাকা ৩৮ পয়সা। এর বিপরীতে ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত সমাপনী দর ছিল ২২ টাকা ৮০ পয়সা। এতে সম্ভাব্য উত্থানের হার দাঁড়ায় ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।

ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের শেয়ারের সমাপনী দর ৪৫ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৬৭ টাকা ২৫ পয়সায় পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য দরবৃদ্ধি ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, পূবালী ব্যাংকের শেয়ারের ৫ অক্টোবরের সমাপনী দর ছিল ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা। সিএএল বাংলাদেশ শেয়ারটির লক্ষ্যদর নির্ধারণ করেছে ৫৫ টাকা ৮৮ পয়সা, যা সম্ভাব্য ৪৪ শতাংশ দরবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। তবে এসব হিসাবের মধ্যে নগদ লভ্যাংশ থেকে পাওয়া সম্ভাব্য আয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর ঋণ সম্প্রসারণের সুযোগ

সিএএল বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ শ্রেণীকরণ এবং প্রভিশন সংরক্ষণের কঠোর নিয়ম ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতাগুলোকে আরও স্পষ্ট করেছে। এর ফলে যেসব ব্যাংকের মূলধন ও আর্থিক ভিত্তি তুলনামূলক শক্তিশালী, তাদের কাছে আমানত এবং ভবিষ্যতে ঋণ সম্প্রসারণের সুযোগ বেশি আসতে পারে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২ দশমিক ২ লাখ কোটি টাকা। এ ছাড়া সংকটে থাকা ১০টি ব্যাংকের কাছে কেন্দ্রীভূত ছিল দেশের মোট খেলাপি ঋণের ৭৪ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান ব্যাংক খাতের সম্পদের গুণগত সমস্যার বড় একটি অংশ নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত থাকার চিত্র তুলে ধরে।

এর বিপরীতে, ‘সাইকেল-রেডি’ হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের মধ্যম অনুপাত ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশে, যা গবেষণায় বিবেচিত ১২ দশমিক ৫ শতাংশের মানদণ্ডের চেয়ে বেশি। ওই মানদণ্ডের অতিরিক্ত এসব ব্যাংকের মূলধনের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। ঋণের চাহিদা বাড়লে এই অতিরিক্ত মূলধন ঋণ বিতরণ সম্প্রসারণে কাজে লাগতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ার পূর্বাভাস

সিএএল বাংলাদেশের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এমনটি হলে ২০২৬ সালের জুনের তুলনায় দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ ৬ দশমিক ২৩ লাখ কোটি টাকা বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনের হিসাব বলছে, সম্ভাব্য এই ঋণ সম্প্রসারণের ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসতে পারে ‘সাইকেল-রেডি’ হিসেবে চিহ্নিত ১৪টি ব্যাংক থেকে।

ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রথম পর্যায়ে ব্যক্তিগত ঋণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) অর্থায়ন, ভোক্তা ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে করপোরেট ঋণ, আমদানি অর্থায়ন এবং বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং সেবার কার্যক্রমেও গতি ফিরতে পারে।

পাঁচ ব্যাংকের সম্ভাবনার পেছনে যেসব কারণ

ব্যাংকভিত্তিক মূল্যায়নে সিএএল বাংলাদেশ ব্র্যাক ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাতে শক্তিশালী অবস্থান এবং মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশে অংশীদারত্বকে ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরেছে। এসব বৈশিষ্ট্য ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে জোরালো করছে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সিটি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড, পেমেন্ট সেবা এবং খুচরা ব্যাংকিং ব্যবসাকে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ভোক্তা ব্যয় বাড়তে শুরু করলে এসব ব্যবসার মাধ্যমে ব্যাংকটি উপকৃত হতে পারে।

ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতে পর্যাপ্ত প্রভিশন সংরক্ষণ এবং লেনদেনভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

পূবালী ব্যাংকের দেশব্যাপী বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক ঋণ বিতরণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের কম খরচে আমানত সংগ্রহের সক্ষমতা এবং বিস্তৃত বিতরণ নেটওয়ার্ক অতিরিক্ত তারল্যকে ঋণে রূপান্তর করতে সহায়তা করতে পারে।

সংকট ও সুদহারের সীমা থেকে ঝুঁকি

শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর সামনে প্রবৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও খাতটিতে কয়েকটি ঝুঁকি রয়ে গেছে বলে সতর্ক করেছে সিএএল বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক সংকটের প্রভাব অন্য প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়া, ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধানের ওপর নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতা এবং বড় করপোরেট গ্রাহকদের কাছে ঋণের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২২টি লোকসানে ছিল। একই সঙ্গে ১৯টি ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত আইনগত ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যায়। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুরবস্থা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্যচাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ছাড়া ঋণ ও আমানতের ভারিত গড় সুদহারের ব্যবধান ৪ শতাংশের মধ্যে রাখার বিধান ব্যাংকগুলোর নিট সুদ আয় বা নেট ইন্টারেস্ট মার্জিনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। সিএএল বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ৫৫টি ব্যাংকের সুদহারের ব্যবধান নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল। এসব ব্যাংকের মধ্যে ‘সাইকেল-রেডি’ তালিকায় থাকা ১৪টির মধ্যে ১৩টিও রয়েছে।

বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতাদের কাছে ঋণ কেন্দ্রীভূত থাকাও ব্যাংকগুলোর জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি। বড় কোনো ঋণ পুনর্গঠন করা হলে অথবা নতুন করে ঋণ শ্রেণীকরণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হতে পারে। এতে কোনো কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সব ধরনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েও সিএএল বাংলাদেশ মনে করছে, নিজস্ব মূলধনের বিপরীতে আয় বা রিটার্ন অন ইকুইটির তুলনায় সুপারিশ করা পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের মূল্যায়ন আকর্ষণীয়। তবে নির্ধারিত লক্ষ্যদর অনুযায়ী সম্ভাব্য মুনাফা অর্জন নির্ভর করবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি, ঋণের চাহিদা এবং ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান ও নিয়ন্ত্রক ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর।

Facebook Comments Box

Posted ৯:৪৯ পিএম | সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

sharebazar24 |

এ বিভাগের আরও খবর

মো. সাজিদ খান প্রধান সম্পাদক
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com